‌‘মুসলিম বিশ্ব’ কেন ইরানের পাশে নেই?

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সবাই কমবেশি আক্রান্ত হলেও মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলো পরিস্থিতি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে বলেই মনে হচ্ছে।

মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশই ইরানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না, বরং অনেকে দেশটিকে হুমকি হিসেবেও দেখছে।

মুসলিম দেশগুলো তথাকথিত ‘প্যান-মুসলিম’ বা বৃহত্তর মুসলিম সংহতির কথা বারবার প্রচার করলেও সাম্প্রদায়িক বৈপরীত্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার মতো বাস্তব পরিস্থিতিরও মুখোমুখি।

একই সঙ্গে একটি অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারেও তাদের মধ্যে চরম অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আরব বিশ্বের কাছে নিজেদেরকে ইসলামী সংহতির রক্ষক এবং সকল মুসলিমের জন্য একটি মানবিক বার্তার বাহক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে তেহরান।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিনা আসরাগিস বলেন, আজ সেই ইরানই রমজান মাসের মাঝখানে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে।

পারমাণবিক শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায় ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর থেকে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতেও ইরান হামলা চালাচ্ছে। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল বলেই মনে করা হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্ব কোনো একক বা অখণ্ড সত্তা নয়। প্রতিটি মুসলিম দেশ (যার বেশিরভাগই আরব) মূলত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারাই পরিচালিত হয়।

ফলে কেবল সংহতির খাতিরে তারা ইরানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে ইচ্ছুক নয় বলেই মনে হচ্ছে। তাছাড়া মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতেও ইরানের প্রতি মনোভাব বেশ জটিল।

ইরান কোনো আরব দেশ নয়, তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে এবং জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শিয়া। যদিও বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সুন্নি।

বর্তমান যুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক খুবই সামান্য, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে এই সুন্নি-শিয়া বিভাজন।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বিবিসিকে বলেন, শিয়াদের সঙ্গে সুন্নিদের কোনো সংহতি হতে পারে না, বিশেষ করে যখন শিয়া অধ্যুষিত ইরান সুন্নি রাষ্ট্রগুলোতে হামলা চালায়।

তাছাড়া ইরান তার সুন্নি প্রতিবেশীদের ওপর এমন একটি সময়ে হামলা চালিয়েছে যখন পবিত্র রমজান মাস চলছে। এমনকি ওই দেশগুলোকে আরও গুরুতর সংঘাতে টেনে আনার হুমকিও দিয়েছে, যা সরাসরি তাদের স্বার্থে আঘাত হানে।

কী করতে চেয়েছিল ইরান?
এই অঞ্চলে কিংবা বিশ্বজুড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের খুব বেশি মিত্র কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু এখন কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটি।

প্রায় অর্ধশতাব্দীর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিঘ্নকারী প্রধান দেশগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই ইরানকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং প্রায়শই তাদের প্রতি প্রকাশ্যে শত্রুতা পোষণ করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে, ইরান সুপরিকল্পিতভাবে নিজেকে একটি শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে এবং মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের অগ্রনায়ক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি সুসংহত করার চেষ্টা চালায়।

সাবেক বন্ধু দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ‘প্রধান শত্রু’ এবং ইসরায়েলকে ‘অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর শত্রু’ হিসেবেও ঘোষণা করেছিল ইরান।

তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মডেল অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা। বিশেষ করে এই অঞ্চলের শিয়া সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা।

ইরানের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিশেষ করে সৌদি আরবকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, যাদের ভূখণ্ডে ইসলামের প্রধান পবিত্র স্থানগুলো অবস্থিত।

বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে একে অপরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে রিয়াদ এবং তেহরান।

পারস্য উপসাগরের তেল-সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার (রাজতন্ত্র) সঙ্গে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শাহ শাসনামলের মিল রয়েছে। ফলে আরব দেশগুলো নিজেদের দেশেও ইরানের মতো গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়ে বেশ আতঙ্কিত।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বেশ আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ফলে আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠা নিয়ে ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ কয়েক দশক ধরে চলেছিল, যা অবশেষে ২০২৩ সালে এসে থামে। সে সময় চীনের মধ্যস্থতায় নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে রাজি হয় রিয়াদ এবং তেহরান।

আর এবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর, সৌদি আরব এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছে যে, ইরান তাদের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলতে দ্বিধাবোধ করবে না।

‘আটলান্টিক কাউন্সিল’ এ এক মন্তব্যে ‘মিডল ইস্ট গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল’-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবের লিখেছেন, চলমান সংঘাত যেদিকেই যাক না কেন, আঞ্চলিকভাবে ইরানের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে সেটা এরই মধ্যেই স্পষ্ট। একবার আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে, তা পুনরায় ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব সংহত করতে ইরান কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তুলছে।

লেবানন, সিরিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করার পাশাপাশি লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন মিত্র বাহিনীকে অস্ত্র ও অর্থায়ন করেছে তেহরান।

এমনকি হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে সমর্থনের মাধ্যমে ইরান মুসলিমদের রক্ষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে ফিলিস্তিন ইস্যুকেও ব্যবহার করেছে।

ইরানের এই পদক্ষেপগুলোকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের জন্য লড়াইয়ের থেকেও বরং তেহরানের নিজস্ব প্রভাব বিস্তার এবং এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবেই বেশি দেখেছে অনেক আরব দেশ।

এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার জন্য ইরানের আকাঙ্ক্ষা তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

আস্থার সংকট যে কারণে
অনেক আরব দেশ মনে করে, অতীত কিংবা বর্তমান যেকোনো সময়েই ইরানকে সাহায্য করার অর্থ হলো এমন একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, যাকে তারা আঞ্চলিক ভারসাম্য বিনষ্টকারী এবং নিজেদের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে মনে করে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়, কিন্তু এটি বোঝা যাচ্ছে যে, এর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভঙ্গুর ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফরাসি বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে যে ইরান মাত্র কয়েকটি আঘাতেই তাদের সব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। সব মিলিয়ে ইরান আবারও এই অঞ্চলের প্রধান হুমকি হয়ে উঠছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপট অনিবার্যভাবে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যেতে বাধ্য করবে।

বিশেষ করে আয়রন ডোম-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেতে, যা দেশটির (সৌদি আরব) সুরক্ষা ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে।

এদিকে ইরান সমর্থিত শিয়া বাহিনীগুলো তাদের পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় এগিয়ে আসতে চাইলেও বর্তমানে তাদের সেই সক্ষমতা ও সুযোগ খুবই সীমিত।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী যুদ্ধের ফলে যে তথাকথিত প্রতিরোধের অক্ষ গড়ে উঠেছিল, সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে অনেকটাই নির্মূল করেছে ইসরায়েল। পঙ্গু করে দিয়েছে হামাসকেও। এছাড়া বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কো পালিয়ে গেছেন সিরিয়ার সাবেক নেতা ও ইরানের বন্ধু হিসেবে পরিচিত বাশার আল-আসাদ।

সবশেষ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে ইসলামি বিশ্বে ইরানের প্রতি অবিশ্বাস আরও তীব্রতর হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিনা আসরাগিস বলছেন, তেহরান সম্ভবত ভেবেছিল যে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ওপর চাপ বাড়লে, তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করবে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা ঘটছে।

পারস্য উপসাগরের কিছু দেশ ইরানের সাথেও ভালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিল। ওমান এবং কাতার অনেকবারই ইরান সরকারের সঙ্গে সংলাপে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। তবে ভবিষ্যতে এই দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে কি না, সেটা এখন দেখার বিষয়।

সুন্নি এবং শিয়া
বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সুন্নি (প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ), যেখানে শিয়াদের সংখ্যা তুলনামূলক কম (প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ)।

প্রধান শিয়া জনগোষ্ঠীগুলোর বসবাস মূলত ইরান, আজারবাইজান, ইরাক এবং পাকিস্তানে। মূলত ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যু পরবর্তী উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের মধ্য দিয়ে এই বিভাজনের সূত্রপাত হয়। সে সময় তার অনুসারীদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছিল এই প্রশ্নে যে কে মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী নেতৃত্ব দেবেন?

শিয়ারা (যাদের নামের অর্থই হলো আলীর অনুসারী বা দল) নবীর রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয় আলী ইবনে আবি তালিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিলেন।

তাদের দাবি ছিল যে, নবীর নিকটতম আত্মীয় এবং শিষ্য হিসেবে আলীরই খলিফা হওয়ার বৈধ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে সুন্নিরা বিশ্বাস করত যে, নবীর সবচেয়ে যোগ্য এবং সম্মানিত সাহাবীদের মধ্য থেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা বেছে নেওয়া উচিত।

ইসলামের নবীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবু বকর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। খেলাফতের এই ক্ষমতার লড়াই শেষ পর্যন্ত ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে আলীর হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় নেয়। পরবর্তীতে তার পুত্র হাসান ও হুসাইনও শাহাদাত বরণ করেন।

৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালা শহরের (বর্তমান ইরাক) কাছে হুসাইনের মৃত্যু আজও শিয়াদের কাছে একটি ঐতিহাসিক শোকাবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত।

এর মধ্য দিয়ে প্রাথমিক রাজনৈতিক মতবিরোধ ধীরে ধীরে এক গভীর ধর্মীয় ও মতাদর্শগত বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। মূলত ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবই এই ধর্মীয় সংঘাতকে একটি ভূ-কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপান্তরিত করেছিল।

তখন থেকেই মুসলিম বিশ্বে আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে শিয়া অধ্যুষিত ইরান এবং সুন্নি অধ্যুষিত সৌদি আরব।

ইরানের নেতারা প্রকাশ্যে ইসলামের প্রধান দুই পবিত্র স্থান- মক্কা ও মদিনার রক্ষক হিসেবে সৌদি রাজবংশের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এছাড়া হজের সময় ইরানিদের উস্কানিতে ঘটা বেশ কয়েকটি ঘটনা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তোলে।

তেহরানের প্রভাব সীমিত রাখতে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও আন্দোলনকে অর্থায়ন করেছিল রিয়াদ। যেখান থেকে পরবর্তীতে এমন সব জিহাদি সংগঠনের উত্থান ঘটে যারা সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

মুসলমানদের ওপর প্রভাব বিস্তার
ইরান ও সৌদি আরবের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে চলা এই সংঘাত দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

সৌদি আরবের শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে চান। তিনি তার জাতীয় মহাপরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এ তেল থেকে অর্জিত বিপুল রাজস্ব বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।

সৌদি আরব বর্তমানে সৌর ও বায়ু শক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে তাদের স্থানীয় ফুটবল লিগে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

এসব কারণেই সৌদি আরব এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ইরানসহ তার সব প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

এই লক্ষ্যেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ এবং তেহরান তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেও সম্মত হয়েছে।বিশেষজ্ঞ ব্যালানশের মতে, যুবরাজ সালমান যেকোনো মূল্যে এই স্থিতিশীলতা ‘ধরে রাখতে’ এবং সবার সাথে আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে আমিরাতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজাত আল-সাইদ মনে করেন, ইরান কখনোই তার অতীত নীতিগুলো বাতিল করতে চায়নি। বরং তারা একটি ‘বিপ্লবী আদর্শের রাষ্ট্র’ হিসেবেই রয়ে গেছে। যা পারস্য উপসাগরের অন্য দেশগুলোর ঠিক বিপরীত, যারা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থে আদর্শিক গোঁড়ামি থেকে সরে এসেছে।

আল-সাইদ আরও উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরবের ধর্মীয় রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদের দিকে বিবর্তন এবং আদর্শ নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। কিন্তু আদর্শিক ব্যবস্থাগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি অনড় হয়ে ওঠে, তাদের জন্য যেকোনো বড় ধরনের পরিবর্তন মানেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

আবারও প্রধান হুমকি ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় মূলত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তি স্বাক্ষরের পর। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং পরবর্তীতে মরক্কো- ইসরায়েলের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ক্রমেই বেশ কিছু আরব রাষ্ট্রের সাধারণ শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে ইরান। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল, যদিও এই চুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফিলিস্তিন ইস্যুটি।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের পর কী ঘটবে? তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা- যা দুর্বল হলেও এখনও টিকে আছে এবং হয়তো আরও বেশি বিপজ্জনক সেটাই কি বহাল থাকবে, নাকি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে?

বিশেষজ্ঞ ব্যালানশ মনে করেন, ‘ঘটনাপ্রবাহ যেদিকেই যাক না কেন, একটি বিষয় পরিষ্কার যে- ইরানের পক্ষে খুব শিগগির তার অতীত ক্ষমতার স্তরে ফিরে যাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকুক বা নতুন কোনো নেতৃত্ব আসুক- ইরানকে তার প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে, যা শাহ শাসনামলে ছিল। যখন ইরান কার্যকরভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পুলিশম্যান বা প্রধান নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতো।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

টিটিএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha